তবে কি বেকায়দায় পড়তে চলেছে ইরান?

তবে কি বেকায়দায় পড়তে চলেছে ইরান?

যে প্রক্রিয়ায় বিশ্বরাজনীতিতে নিজেদের শক্তির জানান দিতে চেয়েছিল ইরান, ঠিক তার মধ্য দিয়েই বেকায়দায় পড়ে গেছে তারা। খুব স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব এখন ইরানকে একেবারে কোণঠাসা করার চেষ্টা করবে। একই কাজে হাত লাগাবে সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা। এত কিছু একসঙ্গে সামলানো ইরানের জন্য বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের দ্বৈরথ শুরু কাশেম সোলাইমানিকে হত্যার মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের পাল্টা হিসেবে পরে মার্কিন বিমানঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। আর সেই প্রতিশোধ নিতে গিয়েই এক বিরাট ভুলের বৃত্তে আটকে গেছে দেশটি। ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইউক্রেনের বেসামরিক এক বিমানকে বিধ্বস্ত করেছে। মারা গেছে প্রায় ১৭৬ জন যাত্রী ও ক্রু। তাঁদের মধ্যে ৫৭ জন ছিলেন কানাডার নাগরিক, যাঁদের অধিকাংশই ইরানি বংশোদ্ভূত। ৮২ জন ছিলেন ইরানের এবং ইউক্রেনের নাগরিক ছিলেন ১১ জন।

মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা গণমাধ্যমে প্রবল আলোড়ন তোলে। ফলে প্রাথমিকভাবে ইউক্রেনের বেসামরিক বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা কিছুটা চাপা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বক্তব্য একে আর নিছক দুর্ঘটনায় আটকে রাখেনি। এ ঘটনার স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে ট্রুডো বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতেই ইউক্রেনের বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এরপর পশ্চিমা দুনিয়ার মোড়লেরা একে একে এতে সমর্থন জানাতে থাকে। অবশ্য শুরু থেকেই ইরান এই দাবি অস্বীকার করে আসছিল। এমনকি গতকাল শুক্রবার ইউক্রেনের বিমান বিধ্বস্তের একটি ভিডিও চিত্র প্রকাশ পাওয়ার পরও ইরানের বিমানবাহিনীর প্রধান জোর গলায় দাবি করেছিলেন, ওই বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানেনি। কিন্তু শনিবারই সব উল্টে গেল। নিজেদের বলা কথা নিজেরাই গিলে নিল ইরান। এখন বলা হচ্ছে, ‘অনিচ্ছাকৃত ভুলের’ কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। ইরান অবশ্য এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশও করেছে।

সমস্যা হলো, নিজেরা সঠিকভাবে তদন্ত চালানোর আগে অভিযোগের পুরোপুরি অস্বীকার করা যথার্থ ছিল না। ইরান যেভাবে শুরু থেকেই ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিমান বিধ্বস্তের অভিযোগ নাকচ করে আসছিল, সে ক্ষেত্রে শনিবারের মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেশটিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত শুরুর ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে অনর্থক উসকানি দিয়েছেন, তা কোনো নিরপেক্ষ ব্যক্তির পক্ষে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। কাশেম সোলাইমানিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর বিষয়টিও এভাবে বৈধ করতে চেয়েছিল ইরান। তাই দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিমানঘাঁটিতে হামলার পরও বলতে পেরেছিলেন যে মার্কিন আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হয়েছে। আবার একই সঙ্গে যুদ্ধের পথে না হাঁটার নৈতিক অবস্থানও তিনি নিতে পেরেছিলেন।

কিন্তু প্রথমে অস্বীকার করে কেন হুট করেই সব মেনে নিল ইরান? দেশটির বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব নিশ্চয়ই জানে যে বারংবার নাকচের পর অভিযোগের দায় মাথা পেতে নিলে কী হতে পারে। ইরান এখনো এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম শোনাচ্ছে ইরানের অভ্যন্তরে হওয়া বিক্ষোভের কথা। যেহেতু ইউক্রেনের ওই বিমানে থাকা যাত্রীদের অধিকাংশই ইরানের নাগরিক ছিলেন, সেহেতু এমন প্রতিক্রিয়া একেবারে অস্বাভাবিক নয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশের ভেতরে–বাইরে সৃষ্ট বিরূপ প্রতিক্রিয়া সামলাতেই সত্যিটা স্বীকার করে নিয়েছে ইরান। কারণ, মিথ্যার পিরামিড ধরে রাখা আরও কঠিন। হয়তো এ ক্ষেত্রে ইতিহাস থেকেও শিক্ষা নিয়েছে দেশটি।

আজ থেকে ৩০ বছরের বেশি সময় আগে ঠিক এমনই একটি ঘটনার শিকার হয়েছিল ইরান। ১৯৮৮ সালের জুলাই মাসের শুরুর দিক। যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোড়া এক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছিল ইরানের একটি বেসামরিক বিমান। যুদ্ধবিমান ভেবে ওই বেসামরিক বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫ নামের ওই বিমানে ছিল ২৯০ জন যাত্রী ও ক্রু। যুক্তরাষ্ট্রের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে সবাই নিহত হয়েছিলেন। ওই ঘটনার শিকার ইরানই আজ একই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে পড়েছে। ইতিহাস বোধ হয় এভাবেই ফিরে ফিরে আসে।

ওই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ভুল স্বীকার করে নিয়েছিল। শত্রুতামূলক সম্পর্কের পরও তেহরানের প্রতি তাৎক্ষণিক ‘দুঃখ’ প্রকাশ করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। এ ঘটনা নিয়ে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও গিয়েছিল ইরান। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক চুক্তিতে পৌঁছায় ইরান। ১৯৯৬ সালের ওই চুক্তি অনুযায়ী ইরানকে প্রায় ১৩২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। করেছিল গভীর দুঃখপ্রকাশ। কিন্তু দায় কখনো স্বীকার করেনি। এবার ইরানকেও দাঁড়াতে হয়েছে অভিযুক্তের কাঠগড়ায়। ১৯৮৮ সালের তুলনায় পরিস্থিতি এখন আরও জটিল।

ইউক্রেনের বেসামরিক বিমানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে—বিষয়টি মেনে নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে ইরানের তর্জন-গর্জনের সুযোগ বেশ কমে গেল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী নীতি’র বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি প্রভৃতি পশ্চিমা দেশকে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখার কথা বলাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ঘটনার শুরু থেকেই ইরান সরকার ও বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা এককথায় পশ্চিমা বিশ্বের করা অভিযোগ নাকচ করে দিচ্ছিলেন। এখন আবার তা মেনে নেওয়ায় নৈতিক অবস্থানের দিক থেকে বেশ দুর্বল হয়ে পড়ল ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রের যতই বিরোধিতা করুক ইরান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া দেশটির কাম্য নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রকে এড়িয়ে থাকতে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতেই অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সমর্থন ইরানের প্রয়োজন। বলা হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কানাডার সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক গতিশীল রাখার বিষয়টি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ঘটনার পরম্পরায় যদি কানাডা বা ইউক্রেন ইরানকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে নিয়ে যেতে চায়, তবে বিপদেই পড়বে হাসান রুহানির দেশ। এরই মধ্যে ইউক্রেন ক্ষতিপূরণ চেয়ে বসেছে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতি যদি দক্ষতার সঙ্গে ইরান সামাল দিতে না পারে, তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পুরোপুরি একঘরে হয়ে পড়তে পারে ইরান। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও সৌদি আরবের সরাসরি বিরোধিতা তো থাকছেই।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রেই ইউক্রেনের বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে—এই অভিযোগ শেষ পর্যন্ত মেনে নেওয়া বরং ভালো পদক্ষেপ। এতে করে সহানুভূতিসম্পন্ন বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর কাছে অন্তত নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যার সুযোগ পাবে ইরান। একই সঙ্গে চালাতে হবে ঘটনার সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত। কানাডা ও ইউক্রেন যাতে সেই তদন্তে ও তদন্ত–পরবর্তী পদক্ষেপে সন্তুষ্ট হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে নিষেধাজ্ঞার খাঁড়া কঠোর হতেই থাকবে। দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে হলে এটুকু করতেই হবে ইরানকে। ওদিকে দেশের ভেতরে ওঠা প্রশ্নগুলোরও শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজতে হবে ইরানকে। কারণ, ইউক্রেনের ওই বিমানের যাত্রীদের অধিকাংশই ছিলেন ইরানি বংশোদ্ভূত।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিরোধীরা অবশ্য ইরানের ‘অনিচ্ছাকৃত’ ভুলকে ‘ইচ্ছাকৃত’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, আপাতদৃষ্টিতে একে ইচ্ছাকৃত হামলা বলে মনে হচ্ছে না। যুক্তরাজ্যভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) গবেষক জাস্টিন ব্রংক বলছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইউক্রেনের বিমান বিধ্বস্ত কোনো যৌক্তিক কারণ ইরানের নেই। কারণ, এতে ইরানই সবচেয়ে বেশি ঝামেলায় পড়েছে। দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থা বিশ্বের কাছে অনিরাপদ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের রুট হিসেবে ইরানের দুর্নাম হচ্ছে। এতে দেশটির অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সাধ করে নিজেদের ক্ষতি কেউই করতে চাইবে না।

জাস্টিন ব্রংকের মতে, রাশিয়ার কাছ থেকে অ্যান্টি–মিসাইল সিস্টেম থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রই ইউক্রেনের বিমানে আঘাত হেনে থাকতে পারে। তিনি বলছেন, এমন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তেহরানের কাছাকাছি স্থাপন করা আছে। হতে পারে কোনো প্রযুক্তিগত ভুল বা কোনো সেনার ভুল অনুমানের কারণে বেসামরিক উড়োজাহাজটিকে লক্ষ্যে পরিণত করা হয়েছিল। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় এমন ঘটনা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। এখন যে প্রশ্নটি গুরুতর হয়ে সামনে এসেছে, তা হলো এমন উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে ইরান কেন বেসামরিক বিমান চলাচল বন্ধ করল না?

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচলের নিদারুণ মানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এভিয়েশন সেফটি নেটওয়ার্ক নামের একটি সংস্থার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত ২০ বছরে ইরানে ২২টি বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে। ১৯১৯ সাল থেকে হিসাব করলে সংখ্যাটি হবে ১৫২। এর মধ্যে ৬৩টি ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে শুধু বিমান দুর্ঘটনাতেই ইরানে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ১৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যা সর্বোচ্চ। আঞ্চলিকভাবে ইরানের পেছনে আছে সৌদি আরব, পার্থক্য প্রায় এক হাজার জীবনের। এ থেকেই আন্দাজ করা যায়, উড়োজাহাজ চলাচলের খাতে মানের দিক থেকে কতটা পিছিয়ে ইরান।

অবশ্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানের এতটা পিছিয়ে থাকার অন্যতম দায় যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের স্থানীয় এয়ারলাইন কোম্পানিগুলো নতুন উড়োজাহাজ এবং এ–সংক্রান্ত উপকরণ কিনতে পারে না। এয়ারফ্লিটস ডট নেটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের স্থানীয় এয়ারলাইন কোম্পানিগুলো ২০ থেকে ৩০ বছরের পুরোনো উড়োজাহাজ ব্যবহার করে থাকে।

এককথায়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রচণ্ড অস্বস্তি ও বিরুদ্ধ পরিবেশে আটকে গেছে ইরান। কত দিনে এমন পরিস্থিতি থেকে ইরান বের হতে পারবে—সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে অপেক্ষা ছাড়া গতি নেই।

তথ্য: ফরেন পলিসি, সিএনএন, ওয়াশিংটন পোস্ট, ফোর্বস ও নিউইয়র্ক টাইমস।